কা’পুরুষ!

এ্যাই দ্যাখ্ কত্তগুলা বাটন, Chat Speed অনেক ফার্স্ট! 2MP ক্যামেরা, ব্লুটূথ, 32 WAP Class, ১৬GB ম্যামরি, গান শুনবি- গান? ভিডিও গানও আছে, দেখবি….?

আমার কাছের বন্ধু রানা, নতুন মোবাইল কিনেছে। সেটারই বর্ণনা দিচ্ছে। আর আমি উল্টে-পাল্টে দেখছি। “অনেক দাম, তাই না?” বলতেই সে মুখটা একটু বাকিয়ে, বুকটা ফুলিয়ে বলল- ১৫০০০ টাকা। আমি শুধু বললাম “ও….”

ওর হাতে মোবাইলটা দিয়ে মাথা নিচু করে চলে এলাম। পকেটে হাত দিয়ে আমার ১২০০ টাকা দামের সিটিসেল ফোনটা বের করে ঝাপসা চোখে তাকালাম। বড্ড কান্না পাচ্ছিল। বাসায় এসে বিছানায় ওপড় হয়ে শুয়ে অনেক্ষন কা’পুরুষের মত কাদলাম আর মনে মনে সংকল্প করলাম এই রকম ফোন একদিন আমার হাতেও থাকবে। জানি এই রকম সংকল্প আমাদের মত ছা’পোষা মানুষদের মানায় না, তবুও মাঝে মধ্যে ইচ্ছের ঘুড়িটাকে ঐ নীল আকাশে উড়িয়ে দিতে বড্ড ইচ্ছে করে…….।

প্রতিদিন ১৬ টাকা বাচাতে মেস থেকে পায়ে হেটে কলেজ যেতাম। যাওয়ার পথে মামার ফুচকার দোকানের সামনে জিভের জল খুব কষ্ট করে নিয়ন্ত্রন করতাম। কত সকাল যে খাওয়া হয়নি তার কোন হিসেব নেই। রুটিন করে পড়া ফাকি দিয়ে দোকানে কাজ করতাম। বড্ড কষ্ট করে টাকা যোগাড় করলাম। স্বাধ করে সখের মোবাইল শেষ পর্যন্ত কিনেই ফেললাম! বাজার তন্ন-তন্ন করে খুজে বের করলাম আমার সেই স্বপ্নের ফোনটা! খুব মনে আছে, সেদিন ফোনটা হাতে নিয়ে ফ্যাল-ফ্যাল করে কেঁদেছিলাম, দোকানের সবার অবাক চোখ তখন আমার দিকে। বাসায় এসে ২ রাকাত নামাজ আদায় করেছিলাম, জায়নামাজে বসেও কেদেছিলাম। জানি না সেই কান্না কোন কা’পুরুষের ছিল কি না। তবুও কেদেছিলাম।

সেই শুরু হলো আমার মোবাইল ম্যানিয়া! সারাদিন পড়ে থাকতাম সখের মোবাইল নিয়ে। এই গবেষনা, সেই গবেষনা আরো কত্ত কি! ম্যামরি পুরে গান লোড করলাম, একই দিনে ১০২৩ ছবি উঠালাম, হেড ফোন কানে লাগিয়ে গোটা রাজশাহী ঘুরলাম তবুও কেন জানি মন ভরছে না। এত উত্তেজনা Feel করছিলাম যে রাতে ঠিকভাবে (যদিও কোন রাতেই ঠিকভাবে হয় না) ঘুমই হলো না।

বায়না করে মায়ের কাছে থেকে ৪০০ টাকা নিয়ে P6 খুললাম। তখন থেকে শুরু হলো “নেট ম্যানিয়া”! এবার বুঁধ হয়ে পড়ে থাকতাম নেট নিয়ে। খাইতে নেট, ঘুমাইতে নেট, এমনকি টয়লেটেও নেট আর নেট….! দিন গুলো ধোঁয়ার মত যেতে লাগল। পড়াশোনা সিকোয় তুলে এমন যখন অবস্থা ঠিক তখনি virtually এক অপরিচিতার সাথে হলো পরিচয়। মাঝে মধ্যে Text আদান-প্রদান চলত। আপনি থেকে তুমি, তুমি থেকে তুই। মজার ব্যাপার হলো- তার সাথে যেমন খুব জলদি বন্ধুত্ব হলো আমার, আবার ঠিক তেমনি খুব জলদি সে আমার কঠিন শত্রুও হয়ে গেল! তার মেসেজ দেখলেই আমার গাত্র দাহ শুরু হত! একটা মেসেজের Reply আসতো ২-৩ দিন পর! বড্ড মেজাজ খারাপ হত। তবুও মাঝে মধ্যে মেসেজ দিতাম। একদিন সে আমায় তার সেল ফোন নাম্বর সেয়ার করল। But ব্যালেন্স শূন্য থাকায় কল করতে পারলাম না। পরে করব, এই বলে ফোনবুকে নাম্বারটা সেভ করে রাখলাম।

সেই পরে হতে-হতে দুই মাস পার হয়ে গেল। খুব বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে, মন ভিষন খারাপ। ফোনবুকের নাম্বারগুলো দেখছিলাম, চোখে পড়লো আমার সেই নেট ফ্রেন্ডের নাম্বার। শঙ্কচের বাধা পেরিয়ে কল করলাম তাকে।
-হ্যালো স্লাম্যুআলাইকুম
-আমি
-আমি কে?
-বট গাছের ভূত
-ও….তুই….
-হ্যা আমি, কি অবস্থা?
-আর বলিস না, একটু বাইরে যাব তাই রেডি হচ্ছি
-ও…আচ্ছা
১min ৩২sec কথা হলো তার সাথে। অনেক ব্যাস্ত সে, বাইরে যাবে। সেই জন্য আমার সাথে কথা বলার সময় পেল না। পরে কথা হবে বলে সে ফোনটা কেটে দেয়। তার ঠিক দুই দিন পরের ঘটনা, অনেক্ষন কথা বললাম তার সাথে। কেমন জানি আপন মনে হলো। এই অদ্ভুত Feelings এর সাথে খুব একটা পরিচিত নই আমি। তবুও সব কিছুই কেমন জানি ভালো লাগতে শুরু করল। সব ঐ পাজি কিউপিডের দোষ! হতচ্ছাড়া তীর চালানোর আর যায়গা পেলো না! এখন যে আমি অসহ্য যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছি- কই; কই সেই পাজি কিউপিডটা? বেটাকে ধরে বৃন্দাবনে পাঠিয়ে দেব!!

চলবে…

Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।